মঙ্গলবার  ১৮ই ডিসেম্বর, ২০১৮ ইং  |  ৪ঠা পৌষ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ  |  ১১ই রবিউস-সানি, ১৪৪০ হিজরী

ক্ষমা চাইলেন ভিকারুননিসার গভর্নিং বডির সভাপতি

ডিএ: শিক্ষার্থী অরিত্রী অধিকারীর আত্মহত্যার ঘটনায় সাংবাদিকদের সামনে হাজির হয়ে ক্ষমা প্রার্থণা করেছেন ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি গোলাম আশরাফ তালুকদার। তিনি বলেছেন, প্রয়োজন হলে তিনি পদত্যাগ করতেও রাজি আছেন। নবম শ্রেণির ছাত্রী অরিত্রীর আত্মহত্যার পর শিক্ষার্থীদের টানা আন্দোলনের মধ্যে আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, প্রতিষ্ঠানের বৃহত্তর স্বার্থে আমার পদত্যাগের প্রয়োজন হলে আমি করব। ছয় দফা দাবি নিয়ে আন্দোলনে থাকা শিক্ষার্থীরা আজ বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, গভর্নিং বডির সব সদস্যের পদত্যাগ ও অরিত্রীর বাবা-মায়ের কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইলে তারা শুক্রবার থেকে পরীক্ষায় বসবে। অন্যথায় আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে তারা। এদিন সকাল সাড়ে ৯টা থেকে বেইলি রোডে স্কুলের মূল শাখার ফটকে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করে একদল শিক্ষার্থী। তাদের সঙ্গে কিছু অভিভাবকও যোগ দেন। এর মধ্যে বেলা দেড়টার দিকে স্কুল ফটকের ভেতরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন গোলাম আশরাফ তালুকদার। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের ছয়টি দাবির মধ্যে প্রথম চারটি বাস্তবায়নের পর্যায়ে আছে কিংবা সময়সাপেক্ষ বিষয়। আমরা আগেও বলেছি, অরিত্রীর ঘটনার জন্য আমরা মর্মাহত। আমরা গভর্নিং বডির পক্ষ থেকে এমন ঘটনার জন্য ক্ষমা চাচ্ছি। গভর্নিং বডির পদত্যাগের বিষয়ে এক প্রশ্নে গোলাম আশরাফ বলেন, পদত্যাগের বিষয়টি আমরা গভর্নিং বডির সভায় তুলব। এটা সদস্যদের ব্যক্তিগত ব্যাপার, তারা পদত্যাগ করবেন কিনা। নিজের অবস্থানের বিষয়ে জানতে চাইলে ‘প্রতিষ্ঠানের বৃহত্তর স্বার্থ’ জুড়ে তিনি বলেন, নতুন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগের মাধ্যমে স্কুল ও কলেজকে স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরিয়ে নিতে দুয়েক দিনের মধ্যে গভর্নিং বডি সভায় বসবে। অরিত্রীর মৃত্যুর পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় দ্রুত তৎপর হয়ে উঠলে তদন্ত কমিটি গঠন, স্কুলের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষসহ তিন শিক্ষককে বরখাস্ত, সব শাখার ক্লাস-পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। তবে পরে পরিচালনা পর্ষদের সভায় ভিকারুননিসায় চলমান বছর সমাপনীর দুই দিনের পরীক্ষার সময় নতুন করে নির্ধারণ করার কথা জানিয়েছিলেন পর্ষদের শিক্ষক প্রতিনিধি মুশতারি সুলতানা। নতুন সূচি অনুযায়ী, বৃহস্পতিবারের পরীক্ষা শুক্রবার এবং ৫ তারিখের পরীক্ষা ১১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ভিকারুন্নিসার শিক্ষার্থীদের ছয় দফার মধ্যে রয়েছে, অধ্যক্ষের পদত্যাগ এবং ৩০৫ ও ৩০৬ ধারায় আত্মহত্যার প্ররোচনার অপরাধে অধ্যক্ষের শাস্তি নিশ্চিত করা। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর আচরণ ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে মানসিক স্বাস্থ্যের বিবেচনা করে আলাদা যত্ন নিতে হবে। কোনোভাবেই শারীরিক ও মানসিক চাপ ও অত্যাচার করা যাবে না। কথায় কথায় বহিষ্কারের হুমকি দেওয়া বন্ধ করে অন্যায় ডিটেনশন পলিসি বন্ধ করতে হবে। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক এবং কর্মরত সবার মানসিক সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে মানসিক পরামর্শদাতা থাকতে হবে। শৃঙ্খলাভঙ্গকারী শিক্ষার্থীকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে হবে। গভর্নিং বডির সবাইকে পদত্যাগ করতে হবে। অরিত্রির মা-বাবার সঙ্গে দুর্ব্যবহারের জন্য অধ্যক্ষ ও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে। আজ বৃহস্পতিবার বেলা পৌনে ১২টার দিকে আন্দোলনকারীদের সমন্বয়ক অরিত্রীর সহপাঠী আনুশকা রায় বলে, আজকের মধ্যে সব দাবি মেনে নিতে হবে। প্রথম দাবিটি মেনে নেওয়া হয়েছে। বাকী দাবিগুলোর মধ্যে তিনটি দাবি পূরণ করা সময় সাপেক্ষ। কিন্তু ৫ এবং ৬ নম্বর দাবিটি এখন আমাদের মূল দাবি। এটা মেনে নিলে কাল আমরা পরীক্ষায় অংশ নিব। নইলে আন্দোলন চলতে থাকবে। এর আগের দুইদিনের মতো বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টা থেকে স্কুলের মূল ফটকের সামনের অবস্থান নেয় শিক্ষার্থীরা। ‘ভিকারুন্নিসা মূল সিনিয়র শাখার সকল শিক্ষার্থী’ ব্যানারে চলা আন্দোলনে তারা বিভিন্ন স্লোগান লেখা পোস্টার-ফেস্টুন নিয়ে বিক্ষোভ দেখায়। কয়েকজন অভিভাককেও দেখা গেছে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে। এদিকে অরিত্রীকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে তার বাবা দিলীপ অধিকারীর মামলার পর মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে অরিত্রীর শ্রেণিশিক্ষক হাসনা হেনাকে গত বুধবার রাতে গ্রেফতার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। গত বুধবার রাতে রাজধানীর উত্তরা থেকে ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজের এই শিক্ষককে গ্রেফতার করা হয় বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার এম আতিকুল ইসলাম। অরিত্রীকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে তার বাবা দিলীপ অধিকারীর মামলায় এই শিক্ষককে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তা আতিক। পরে গতকাল বৃহস্পতিবার হাসনা হেনাকে কারাগারে পাঠায় আদালত। ঢাকার মহানগর হাকিম আবু সাঈদ গত বুধবার এই শিক্ষকের জামিন আবেদন নাকচ করে তাকে কারাগারে নেওয়ার আদেশ দেন। হাসনা হেনা ছিলেন অরিত্রীর ক্লাস টিচার। গতকাল বৃহস্পতিবার তাকে আদালতে হাজির করে এই শিক্ষককে কারাগারে পাঠানো আবেদন করেন গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক কামরুল হাসান তালুকদার। অপরদিকে তার জামিন চেয়ে আবেদন করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী। জামিনের বিরোধিতা করে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, জামিন পেলে পলাতক হয়ে মামলার তদন্তে তিনি বিঘ্ন সৃষ্টি করবেন। অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী জাহাঙ্গীর আলম জামিন আবেদন করে বলেন, তিনি এ ঘটনায় জড়িত নন। তার সম্পর্কে বাদী কোনো অভিযোগও করেন নাই। মঙ্গলবার রাতে পল্টন থানায় করা ওই মামলায় হাসনা হেনার পাশাপাশি রাজধানীর নামি ওই বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস ও প্রভাতি শাখার প্রধান জিনাত আখতারকেও আসামি করা হয়। নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী অরিত্রীর আত্মহত্যার পর সহপাঠি ও অভিভাবকদের বিক্ষোভের মুখে শিক্ষা মন্ত্রণালয় আসামি তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে গত বুধবার র‌্যাব ও পুলিশকে চিঠি দেয়। এর মধ্যে সন্ধ্যায় মামলাটির তদন্তভার পেয়ে তৎপর হয় গোয়েন্দা পুলিশ। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নাজনীনসহ অন্য দুই শিক্ষককে খোঁজা হচ্ছে বলে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) আবদুল বাতেন জানিয়েছিলেন। তিনি সন্ধ্যায় বলেছিলেন, আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। খুব শিগগিরই তাদের গ্রেফতার করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। মামলা হওয়ার পর গত বুধবার দিনভর স্কুলে দেখা যায়নি ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নাজনীনসহ অন্য তিন শিক্ষককে; শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ চললেও আগের দিন স্কুলে ছিলেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ। মামলা দায়েরের পর ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নাজনীন মঙ্গলবার রাতে বলেছিলেন, শুনেছি আমাকেসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গত বুধবার সন্ধ্যায় ভিকারুননিসা স্কুল ও কলেজ পরিচালনা পর্ষদ জরুরি সভায় বসে তিন শিক্ষককে বরখাস্ত করেন। তার আগে মন্ত্রণালয় ওই তিন শিক্ষকের এমপিও বাতিল করে। নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী অরিত্রী গত সোমবার আত্মহত্যা করার পর থেকে উত্তেজনা চলছে রাজধানীর নামি এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা নানা অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ করছেন। গত রোববার বার্ষিক পরীক্ষা চলার সময় মোবাইল ফোনে নকল করার সময় অরিত্রী ধরা পড়েন বলে স্কুল কর্তৃপক্ষের দাবি। ওই ঘটনার পরদিন তার বাবা-মাকে ডেকে নেওয়া হয়। তখন অরিত্রীর সামনে তার বাবা-মাকে অপমান করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এরপরই ঘরে ফিরে আত্মহত্যা করেন এই কিশোরী। মঙ্গলবার শিক্ষার্থীরা ফুঁসে উঠলে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ নিজে যান ভিকারুননিসায়; দুটি তদন্ত কমিটি করা হয়। একটির প্রতিবেদনে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে শিক্ষামন্ত্রী গত বুধবার জানান। দিলীপ তার মেয়ের বিরুদ্ধে স্কুল কর্তৃপক্ষের তোলা নকলের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, তবে স্বীকার করেন যে তা মেয়ে মোবাইল নিয়ে স্কুলে গিয়েছিল। মামলার এজাহারে বলা হয়, অরিত্রী অধ্যক্ষের পা ধরে মাফ চাইলেও তাকে ক্ষমা করা হয়নি, তার বাবা-মা করজোড়ে ক্ষমা চাইলেও তাদের কথাও শোনা হয়নি। দিলীপ মামলায় বলেছেন, শিক্ষকদের ‘নির্মম আচরণে’ মর্মাহত হয়ে অরিত্রী আত্মহত্যায় বাধ্য হয়। একই সাথে শিক্ষকদের ‘নির্দয় ব্যবহার ও অশিক্ষকসুলভ আচরণ’ অরিত্রীকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করেছে।

একটি প্রতি উত্তর ট্যাগ

আপনার ইমেল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না. প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলি চিহ্নিত *

*

WP Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com