মঙ্গলবার  ২১শে জানুয়ারি, ২০১৯ ইং  |  ৯ই মাঘ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ  |  ১৫ই জমাদিউল-আউয়াল, ১৪৪০ হিজরী

বিদেশী অনুদান কমে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ব্র্যকের হাজার হাজার স্কুল

এক্সক্লুসিভ: বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠির শিশুদের শিক্ষার আওতায় আনতে হাজার হাজার বিদ্যালয় গড়ে তুলেছিল। কিন্তু বর্তমানে ক্রমান্বয়ে ওসব বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এক শ্রেণীকক্ষ ও এক শিক্ষক কর্মসূচির মাধ্যমে ব্র্যাক প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয় গড়ে তুলেছিল। ২০০৫-০৬ সালের দিকে ব্র্যাক পরিচালিত প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল প্রায় ৪০ হাজার। কিন্তু বিদেশী অনুদান কমে যাওয়া ও সরকারি বিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ব্র্যাকের এসব স্কুল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে দেশে ব্র্যাক পরিচালিত প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১০ হাজারের কিছু বেশি। ওই হিসাবে গত এক যুগে ব্র্যাক পরিচালিত প্রায় ৩০ হাজার স্কুলই বন্ধ হয়ে গেছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ব্র্যাক সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বিগত কয়েক বছর ধরেই প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের বিদ্যালয়শুমারিতে ব্র্যাকের স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। প্রতি বছরই ব্র্যাকের বন্ধ হয়ে যাওয়া স্কুলের সংখ্যা বাড়ছে। ২০১৫ সালে দেশে ব্র্যাক পরিচালিক প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল ১৩ হাজার ৫২২টি। ২০১৬ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১২ হাজার ৭৬৭টিতে। ২০১৭ সালে দেশে ব্র্যাক পরিচালিত প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল ১২ হাজার ৩৯৪টি। ২০১৮ সালে ওই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৩১৮টিতে। ব্র্যাকের শিক্ষা কর্মসূচি সংশ্লিষ্টদের মতে, কয়েক বছর ধরে আমেরিকা, ইউরোপ এবং অস্ট্রেলিয়ার দাতা সংস্থাগুলো অনুদান কমিয়ে দিয়েছে। গত কয়েক বছরে শিক্ষা খাতে ব্র্যাকের অনুদান প্রাপ্তির হার প্রায় ৮০ শতাংশ কমে গেছে। ওই কারণেই বেসরকারি এ সংস্থাকে স্কুলগুলোর কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে হচ্ছে।
সূত্র আরো জানায়, বর্তমানে দেশজুড়ে সরকারি বিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়ে যাওয়াকে ব্র্যাকের স্কুল কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে দেখছেন শিক্ষা খাতসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, বর্তমানে দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৩৮ হাজার ৯১৬টি। নতুন করে জাতীয়করণকৃত প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ২৬ হাজার ৬১৩টি। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পৌঁছে যাচ্ছে সরকারের শিক্ষা কার্যক্রম। তবে ব্র্যাকের বেশির ভাগ স্কুল বন্ধ হয়ে গেলেও শিশু নিকেতন নামে শিক্ষা কর্মসূচি পরিচালনা করছে। সেক্ষেত্রে অভিভাবকদের সব খরচ বহন করতে হয়। সেজন্য শিশু নিকেতনে খুব বেশি শিক্ষার্থী পাওয়া যাচ্ছে না। তাছাড়া মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে ব্র্যাক। মাধ্যমিক পর্যায়ে ঝরে পড়ার হার অনেক বেশি হওয়ায় ওই প্রকল্পটি নেয়া হয়েছে। বর্তমানে পরীক্ষামূলকভাবে কিছু বিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। ২০১৩ সালে ৮টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় নিয়ে যাত্রা হলেও বর্তমানে মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে ১৪টি।
এদিকে এ প্রসঙ্গে ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক ডা. মুহাম্মদ মুসা জানান, ব্র্যাক যখন শিক্ষা কর্মসূচি শুরু করে তখন দেশের প্রাথমিক শিক্ষার অবস্থা অত্যন্ত নাজুক ছিল। প্রত্যন্ত অঞ্চলের এলাকাগুলোয় বিশেষ করে হাওড়াঞ্চল ও নদীভাঙন কবলিত অঞ্চলগুলোর সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা করে দেয়াই ছিল ব্র্যাকের লক্ষ্য। সময়ের পরিক্রমায় দেশের প্রাথমিক শিক্ষার প্রসার ঘটেছে। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে ঝরে পড়ার হার অনেক কমেছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতেও সরকারি উদ্যোগে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ফলে আমাদের স্কুলের সংখ্যাও কমেছে। একসময় প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক মিলে ৩৫-৪০ হাজারের মতো স্কুল ছিল। এখন স্কুলের সংখ্যা অনেক কম। বর্তমানে দাতা সংস্থাগুলো অনুদানের ক্ষেত্রে আগের তুলনায় অনেক কৌশলী হয়েছে। অনুদানের খাত ও অঞ্চল নির্বাচনের ক্ষেত্রে অনেক পরিবর্তন এসেছে।
অন্যদিকে এ বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আবু হেনা মোস্তফা কামাল জানান, এক সময় বেসরকারি খাতেই দেশের প্রাথমিক শিক্ষার উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল। যেসব এলাকায় সরকারি বিদ্যালয় করা যায়নি, সেসব এলাকায় দাতা সংস্থাগুলোর আর্থিক সহায়তায় বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা করতো। তবে প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে এখন সে চিত্র বদলে গেছে। বিশেষ করে গত ১০ বছরে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগে প্রাথমিক শিক্ষার বেশির ভাগ অংশই সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোয় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। সরকারি বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য উপবৃত্তির পাশাপাশি মিড-ডে মিল চালু করা হয়েছে। সরকারি স্কুলের বাইরে রস্কসহ বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায়ও বিদ্যালয় চালু করা হচ্ছে। সরকারের এসব উন্নয়নের ফলে এনজিও পরিচালিত স্কুলগুলোর প্রয়োজনীয়তা কমে এসেছে। পর্যাপ্তসংখ্যক শিক্ষার্থী না পাওয়ায় বিদ্যালয়গুলো ক্রমে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

একটি প্রতি উত্তর ট্যাগ

আপনার ইমেল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না. প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলি চিহ্নিত *

*

WP Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com