মঙ্গলবার  ১৮ই ডিসেম্বর, ২০১৮ ইং  |  ৪ঠা পৌষ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ  |  ১১ই রবিউস-সানি, ১৪৪০ হিজরী

ভিকারুননিসার প্রভাতী শাখার প্রধান শিক্ষক বরখাস্ত

ডিএ: ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী অরিত্রী অধিকারীর আত্মহত্যার ঘটনায় ঢাকার নামি এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রভাতী শাখার প্রধান শিক্ষক জিন্নাত আরাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে ওই শিক্ষককে মঙ্গলবার সাময়িক বরখাস্ত করা হয় বলে প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস জানান। স্কুল কর্তৃপক্ষের দাবি, নবম শ্রেণির ছাত্রী অরিত্রী রোববার পরীক্ষায় মোবাইল ফোনে নকলসহ ধরা পড়ে। এরপর গত সোমবার দুপুরে ঢাকার শান্তিনগরের বাসায় নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে আত্মহত্যা করে মেয়েটি। স্বজনদের দাবি, ওই ঘটনার পর অরিত্রীর বাবা-মাকে ডেকে নিয়ে ‘অপমান করেছিলেন’ অধ্যক্ষ। সে কারণে ওই কিশোরী আত্মহত্যা করে। অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস বলেন, অরিত্রী প্রভাতী শাখায় পড়ত। ডিউটি টিচার তার নকল ধরে শাখা প্রধানের কাছে যান। পরে শাখা প্রধান তাকে বহিষ্কার করে পরীক্ষা স্থগিত করেন। পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে শাখা প্রধানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এদিকে অরিত্রীর আত্মহত্যার ঘটনা তদন্তে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ভিকারুননিসা কর্তৃপক্ষ দুটি তদন্ত কমিটি করেছে। উভয় কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পেলেই দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ।
এদিকে, নিজ প্রতিষ্ঠানের নবম শ্রেণির ছাত্রী অরিত্রি অধিকারীর মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে তাঁর কার্যালয়ে যান সাংবাদিকরা। এ সময় অরিত্রি অধিকারী ও তাঁর বাবার সঙ্গে খারাপ ব্যবহারের বিষয়টি অস্বীকার করেন নাজনীন ফেরদৌস। সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌসকে প্রশ্ন করেন, অনেকদিনের অভিযোগ স্কুল কলেজের শিক্ষকরা আসলে মানবিক না। শিক্ষকদের আসলে কেমন হওয়া উচিত? উত্তরে নাজনীন ফেরদৌস বলেন, অবশ্যই মানবিক হওয়া উচিত, বাচ্চাদের প্রতি। বোঝাতে হবে, যে তুমি এ ধরনের অন্যায় করবা না, এটা খারাপ। অবশ্যই হওয়া উচিত। তিনি বলেন, আমি সজ্ঞানে কারো সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করি না। অরিত্রির মৃত্যুতে গতকাল মঙ্গলবার বিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থী পরীক্ষা বর্জন করে বিক্ষোভ জানিয়েছে। তাদের পরীক্ষা নেয়ার ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে অধ্যক্ষ বলেন, সেটাও আমরা ব্যবস্থা করব। বাচ্চাদের পরীক্ষা নেয়ার ব্যবস্থা করব। ওরা যা চায়, সেভাবেই ব্যবস্থা হবে। ওরা যেভাবে চায়, সেভাবেই পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যাঁরা পরীক্ষা দিতে পারছে না, ওরা আমাদের জানিয়েছে। যে আমরা পরীক্ষা দিতে পারছি না আজকে। আমাদের আরেক দিন পরীক্ষা নেয়ার ব্যবস্থা করেন। আমরা সে ব্যবস্থা করেছি। এ সময় আরেক ছাত্রীর মা কথা বলেন। তিনি বলেন, গার্ডিয়ান হিসেবে আমি একটু কথা বলি। এই ভিকারুননিসা নূন স্কুল থেকে আমার বাচ্চা এবার এসএসসি পরীক্ষা দেবে। আমি যেটা বলব, এখানে আমি ক্লাস ওয়ান থেকে পড়ানোর সময়, আমি এই স্কুলে বারবার বলেছিলাম যে, আমাদের বাচ্চাদের কাউন্সেলিংয়ের দরকার আছে। বিশ্বের প্রতিটা স্কুলে এই ব্যবস্থা আছে। কিন্তু এই কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা কেন করছে না? আমরা অভিভাবকরা প্রশাসনের কাছে জিম্মি, বাসায় সন্তানের কাছে জিম্মি। তার কারণ একটা, আমাদের কাছ থেকে আমাদের বাচ্চাদের একটা গ্যাপ তৈরি হয়েছে। আমাদের বাচ্চার সঙ্গে যখন না পারি, তখন আমরা আমাদের স্কুলের প্রতি নির্ভর করি এবং স্কুলকে আমরা যখন এসে বলি যে, আমার বাচ্চার এই সমস্যা হয়েছে। বাচ্চার নৈতিক মূল্যবোধের জন্য কাউন্সেলিং। কোনটা ভালো, কোনটা নেগেটিভ। কোনটা পজিটিভ। সেই জিনিসটাই স্কুল করে না। আমরা বারবার বলেছি, আমার বাচ্চা সম্পর্কে কোনো অবজেকশন থাকলে আমাকে নোটিশ দেন। আমাদের ডেকে বলেন। আমাকে নোটিশ দেন।
অরিত্রী অধিকারীর আত্মহত্যার ঘটনায় অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ ও গভর্নিং বডির সদস্যদের পদত্যাগের দাবিতে গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে বিক্ষোভ করেছেন ছাত্রীরা। এতে যোগ দেন অভিভাবকরাও। ছাত্রীরা পরীক্ষা বর্জন করে প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে কর্তৃপক্ষের বিরূপ আচরণের প্রতিবাদ জানায়। অভিমান নিয়ে বন্ধু অরিত্রী অধিকারীর চলে যাওয়া কোনোভাবেই মানতে পারছে না তার সহপাঠীরা। অরিত্রীর কথা মনে করে কান্নায় ভেঙে পড়ছে তারা। অরিত্রীর আত্মহত্যার ঘটনার প্রতিবাদ ও সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে পরীক্ষা বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয় কেউ কেউ। তারা অভিযোগ করে, স্কুল কর্তৃপক্ষের অযাচিত আচরণের কারণেই অরিত্রী আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে। ভিকারুননিসা নূন স্কুলের সামনে বিক্ষোভরত এক শিক্ষার্থী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে, অবশ্যই তার (অরিত্রী) জন্য যদি পরীক্ষা বর্জন করতে হয় আমি করব। কিন্তু তবু আমি তার এ রকম অবস্থার বিচার চাই। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে সহমত পোষণ করে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান অভিভাবকরা। বিক্ষোভরত আরেক শিক্ষার্থী বলে, আমরা স্টুডেন্ট আমরা কেন নিয়ম মানব না, আমরা সব নিয়ম মানব, যখনই প্রিন্সিপাল-ভাইস প্রিন্সিপাল আর গভর্নিং বডির ওঁরা ওঁদের ভুল স্বীকার করে পদত্যাগ করবেন, সঙ্গে সঙ্গে এখনই আমরা মেয়েরা পরীক্ষার হলে ফিরে যাব। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া স্কুলের এক ছাত্রীর বাবা বলেন, এটার একটা সুষ্ঠু তদন্ত হোক, কে দোষী সেটা চিহ্নিত হোক, তার বিচার হোক, এই মুহূর্তে এটাই আমাদের দাবি। এক নারী অভিভাবক বলেন, যেখানে মরে গেলেও কিছুই বিচার হয় না। আর আমাকে বকা দিয়েছে, আমি তো প্রমাণই করতে পারব না, আপা আমাকে এগুলো বলেছে, তুমি কি চাও আমি স্কুলে যাই। তুমি যদি আমাকে স্কুলে পাঠাও, তুমি কি চাও আমি সুইসাইড করি? ঘটনা সম্পর্কে জানতে সকালে ভিকারুননিসা নূন স্কুলে যান শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। এ সময় শিক্ষামন্ত্রীর গাড়ি আটকে দেয় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। তিনি শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি জানান, বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় করে তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আমলে নিয়ে ব্যবস্থা নেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।এদিকে এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবিতে স্কুল গেটের বাইরে প্ল্যাকার্ড নিয়ে মৌন প্রতিবাদ করায় দুই পথচারীকে আটকের চেষ্টা করে পুলিশ। আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের তোপের মুখে তাদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

একটি প্রতি উত্তর ট্যাগ

আপনার ইমেল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না. প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলি চিহ্নিত *

*

WP Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com