এক্সক্লুসিভ: বৈদেশিক অন্যতম মুদ্রা আয়কারী হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি শিল্প এখন হুমকির মুখে। র‌্যাব পুলিশের অভিযানেও থামানো যাচ্ছে না চিংড়িতে অপদ্রব্য পুশ। তার উপর অ্যামোনিয়া গ্যাসের অভাবে সৃষ্টি হয়েছে নতুন সংকট। গত ৩ বছরে হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি কমেছে। আর চলতি অর্থ বছরে এ অবস্থা চলতে থাকলে শিল্পটির সংকট মহাসংকটে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অথচ বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি শিল্পের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় দেড় কোটি লোক জড়িত। শিল্প সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, চিংড়ি রপ্তানির সিংহভাগ দেশের বৃহত্তর খুলনাঞ্চলের। ওই অঞ্চলে প্রায় ৩০টি হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বাকি ১০টি চট্টগ্রাম অঞ্চলে। যমুনা সার কারখানা থেকে অ্যামোনিয়া গ্যাস বিক্রি বন্ধ থাকায় হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি শিল্পে নতুন করে সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। শিল্প মালিকরা বিভিন্ন স্থান থেকে অধিক মূল্যে গ্যাস কিনে তাদের কোল্ড স্টোরেজ ও বরফ কল চালিয়ে আসছিল। বর্তমানে উচ্চ মূল্যেও গ্যাস মিলছে না। এমন অবস্থা অব্যাহত থাকলে শিল্পটি বন্ধের আশঙ্কা রয়েছে। তাছাড়া বৃহত্তর খুলনাঞ্চলে অসাধু চিংড়ি ব্যবসায়ীরা র‌্যাব পুলিশের সাড়াসি অভিযানেও চিংড়িতে অপদ্রব্য পুশ চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে বিদেশের বাজারে হিমায়িত চিংড়ি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো ও প্রসিদ্ধ বায়াররা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। বিদেশের অনেক বাজারে চিংড়ি ক্রয় বন্ধও করে দেয়। কিন্তু পরবর্তীতে মুচলেকা দিয়ে রপ্তানি ঠিক রাখা হয়। শুধু বিদেশের বাজারে নয় খোদ খুলনার অভিজাত হোটেল রেস্তোরাতেও পুশকৃত চিংড়ি সরবরাহ হচ্ছে। মাঠপর্যায় থেকে ফিস প্রসেসিং কোম্পানিগুলো পর্যন্ত সর্বত্র পুশকৃত চিংড়ির ছড়াছড়ি মহামারি রোগের মত। প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যাকে মহাবিপর্যয়ের সাথে তুলনা করেছেন।
সূত্র জানায়, চিংড়িতে পুশ করে বাজারজাতের মাধ্যমে অসাধু সিন্ডিকেট চক্র রাতারাতি কোটি টাকার মালিক বনে যাচ্ছে। আর প্রকৃত ব্যবসায়ীরা হতাশ হয়ে পড়ছে। বিদেশীদের কাছে দেশের সুনাম নষ্ট হচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের এই বৃহৎ খাতকে যারা প্রশ্নবিদ্ধ করছে তাদেরকে একেবারেই কেন নিবৃত করা যাচ্ছে না তা বোধগম্য নয়। সম্প্রতি র‌্যাব পুলিশ ও জেলা প্রশাসন রূপসা এলাকায় বেশ কয়েকটি অভিযান চালিয়ে কয়েক লাখ টাকার পুশকৃত বাগদা ও গলদা চিংড়ি জব্দ করেছে। সিলগ্যালা করেছে ডিপোগুলোকে এবং উদ্ধার করেছে পুশকরা সিরিঞ্জ, জেলী, জেলী জ্বালানো গ্যাসের চুলা ও হাড়ি পাতিল। ওই সময় নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট দ্বারা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জেল ও জরিমানা করা হয়। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে গত সপ্তাহে খুলনার একটি অভিজাত হোটেলে অভিযান চালিয়ে কয়েক মণ পুশকৃত চিংড়ি মাছ উদ্ধার করা হয়।
সূত্র আরো জানায়, বাংলাদেশ থেকে হিমায়িত চিংড়ি ও সাদা মাছ রফতানি কমছে। গত তিন বছর ধরে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এসময় বিদেশে রফতানির পরিমাণের সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনও কমে গেছে। অবকাঠামোগত অসুবিধা, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও খাবার ব্যবস্থাপনার সংকট, আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা করা, অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি এবং বেশ কিছু প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রফতানি কমে গেছে। অথচ দেশের ১ কোটি ৪৬ লাখ ৯৭ হাজার মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে চিংড়ি ও সাদা মাছ চাষ, বেচাকেনা, প্রক্রিয়াকরণ এবং রফতানি কার্যক্রমের সাথে জড়িত রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মৎস্য বিশেষজ্ঞরা রপ্তানির স্বার্থেই অর্থাৎ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের উপর গুরুত্বারোপ করছেন। তাদের মতে, কোন অবস্থায় যেন অসাধু ব্যবসায়ীরা চিংড়ির দেহে পানি, ভাতের মাড়, সাবু, এরারুট, লোহা বা সীসারগুলি, মার্বেল, ম্যাজিকবলসহ অনাকাঙ্খিত পদার্থের দ্বারা পুশ করে চিংড়ির ওজন বাড়িয়ে অধিক মুনাফা অর্জনের চেষ্টা না করে। রাসায়নিক তরল পদার্থের মধ্যে চিংড়ি ভিজিয়ে রেখে ওজন বাড়াবার চেষ্টা না করা প্রভৃতি।
এদিকে বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো ও বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএফইএ) তথ্যানুযায়ী, সর্বশেষ গত ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে ১১০ মিলিয়ন পাউন্ড চিংড়ি বিদেশে রফতানি করা হয়। এ থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। এর আগের বছর ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে ১২০ মিলিয়ন পাউন্ড চিংড়ি মাছ রফতানি করা হয়। এ বছর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হয় সোয়া ৪ হাজার টাকা।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস্ এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের নেতা মো: মনির হোসেন জানান, একমাস ধরে অ্যামোনিয়া গ্যাসের সংকট চলছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিশেষভাবে মাছ রপ্তানিকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। গড়ে খুলনার প্রতিটি মাছ কোম্পানীতে ১০টি অ্যামোনিয়া গ্যাস সিলিন্ডারের চাহিদা রয়েছে। দেশের অধিকাংশ কোম্পানীগুলো খুলনাঞ্চলে। গ্যাসের সংকট সমাধানে কর্তৃপক্ষ এখনো পর্যন্ত এগিয়ে আসেনি। আর একটি মহলের পৃষ্ঠপোষকতায় শত কড়াকড়ির মাঝেও চলছে চিংড়িতে অপদ্রব্য পুশের অবাধ ব্যবহার। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে কঠোর ভূমিকা নিতে হবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে