এক্সক্লুসিভ: দেশে স্কুলের অনেক ভয়ঙ্কর সব অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে কিশোররা। শুধুমাত্র ইভ টিজিং কিংবা মহল্লাভিত্তিক বখাটেপনা নয়, কিশোররা গ্রুপ করে পরিকল্পিত হত্যায়ও অংশ নিচ্ছে। সহপাঠীকে অপহরণ করে দাবি করছে মুক্তিপণ। ধর্ষণ ঘটনায় জড়াচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে শুধু আইনের প্রয়োগ ও কঠোরতায় তেমন ফল আসবে না। বরং কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে প্রয়োজন সামাজিক, পারিবারিক শাসন ও সচেতনতা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, প্রতিবছর সারা দেশে কিশোর অপরাধসংক্রান্ত ৫ শতাধিক মামলা হচ্ছে। তবে সম্প্রতি মামলার সংখ্যা কিছুটা কমলেও কিশোরদের অপরাধের ধরন বেড়েছে। প্রতিবছর হত্যা ও ধর্ষণসংক্রান্ত ২ শতাধিক ঘটনায় কিশোররা জড়িত থাকছে। গ্রামপর্যায়েও কিশোর অপরাধের বিস্তার ঘটেছে। তারা ইন্টারনেট থেকে নানা অপরাধের খোরাক পাচ্ছে। টেলিভিশন সিরিজ থেকে জেনে নিচ্ছে কৌশল। ওসব কিশোরদের বেশির ভাগই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। তারা মাদকসেবনের টাকা জোগাতে গিয়েও বড় ধরনের অপরাধ করছে। এমনকি মা-বাবাকেও হত্যার অভিযোগে আটক রয়েছে অনেক কিশোর-কিশোরী।
সূত্র জানায়, কয়েক মাস আগে রাজধানীর আগারগাঁও তালতলা এলাকায় ষষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্রকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। ওই ঘটনায় যাদের আটক করা হয় তারা স্থানীয় স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। একই ভবনে তাদের বসবাস। মোবাইল নিয়ে বিরোধে দুই কিশোর হত্যার পরিকল্পনা করে। তারা ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রটিকে ডেকে নেয় ১০ তলা ভবনের ছাদে নিয়ে মারধর করে একটি বস্তায় ভরে পানির ট্যাংকে ফেলে দেয়ার চেষ্টা চালায়। পাশে একটি নির্মাণাধীন ভবন থেকে ঘটনা দেখে বাড়ির মালিকসহ পুলিশকে খবর দেয়া হলে পুলিশ পৌঁছে শিশুটিকে উদ্ধার এবং দুই কিশোরকে গ্রেপ্তার করে। তাছাড়া সম্প্রতি পিরোজপুরে ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ না পেয়ে সালাউদ্দিন (১৩) নামে এক স্কুলছাত্রকে হত্যা করে একদল কিশোর। তারা টেলিভিশনে ভারতের সিরিয়াল ক্রাইম প্যাট্রোল দেখে অপরাধের কৌশল শিখেছে বলে পুলিশ দাবি করেছে। গত মাসে কিশোরগঞ্জের ভৈরবে ৩ কিশোর অর্থ লোভে এক সহপাঠীকে খুন করে। গত জানুয়ারিতে একটি অপহরণ ঘটনায় যশোরে মুক্তিপণের ৫ লাখ টাকা নিতে গিয়ে আটক হয় বিলাল নামের এক কিশোর। পরে বন্দুকযুদ্ধে তার মৃত্যু হয়। গ্রেপ্তারের পর বিলালের দেয়া তথ্যে উদ্ধার হয়েছিল চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রের লাশ।
সূত্র আরো জানায়, গত মার্চে পুরান ঢাকায় হত্যার শিকার হয় ১৫ বছরের সিজান। তাকে হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে ইমন ও মুন্না মিয়া নামের দুই কিশোর। স্থানীয় গ্যাং কালচারের অংশ হিসেবে তাদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছিল বলে পুলিশ জানায়। তখন বংশাল ও চকবাজার থানা এলাকার সুরিটোলা, চানখাঁরপুল ও মালিটোলা এলাকায় অনেক কিশোর অপরাধী গ্রুপ শনাক্ত হয়। এর আগে রাজধানীর উত্তরায় আদনান কবীর নামে এক স্কুলছাত্রকে হত্যার পর সেখানে একাধিক কিশোর গ্রুপ ধরা পড়ে। ওসব কিশোরের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গ্রুপ খোলা ছিল। তাছাড়া গত বছর মার্চে চট্টগ্রামের পশ্চিম মাদারবাড়ীর সেন্ট্রাল পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র মেহেদী হাসানকে অপহরণ ঘটনায় মুক্তিপণ নিতে গিয়ে গ্রেপ্তার হয় কিশোর গ্যাংয়ের ৪ সদস্য। তারা ছাত্রটিকে অপহরণের পর ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেছিল।
এদিকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সংশ্লিষ্টদের মতে, মা-বাবা সন্তানদের সঠিকভাবে পরিচর্যা ও পর্যবেক্ষণ না করায় শিশুরা বখাটেপনায় জড়িয়ে যাচ্ছে। সঙ্গে রয়েছে ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোনের কুপ্রভাব। এর আগে শাঁখারীবাজার এলাকায় একটি হত্যার ঘটনায় কিশোরদের একটি গ্রুপ শনাক্ত হয়। সেখানে দেখা গেছে ফেসবুকের মাধ্যমে গ্রুপ তৈরি করে নানা অপরাধ করছে কিশোররা।
অন্যদিকে সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, পারিপার্শ্বিক নানা কারণে অনেক আগে থেকেই অপরাধী তালিকায় অল্পবয়সীদের নাম এসেছে। তবে নব্বইয়ের পর খুন, ধর্ষণের মতো ঘটনাতেও জড়াচ্ছে স্কুলপড়ুয়া কিশোররা। সমাজ তাদের যথাযথ পরিবেশ দিতে পারছে না। পরিবার, বিদ্যালয় কোথাও প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও পরিবেশ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। সার্বিকভাবে আগ্রাসী মানসিকতা নিয়ে শিশুরা বেড়ে উঠছে। পাশাপাশি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রভাবও রয়েছে। কঠোর আইনি পদক্ষেপ দিয়ে সাময়িক দমন হলেও কিশোর অপরাধের প্রতিকার হয় না। তবে পরিবার ও সমাজে যদি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ থাকে তাহলে কিশোররা অপরাধমূলক ঘটনায় কম জড়াবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে