এক্সক্লুসিভ: উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের গত বছরের তুলনায় বেশি দামে পাঠ্যবই কিনতে হবে। কোনো কারণ না থাকা সত্ত্বেও জাতীয় পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) ওই স্তরের বইয়ের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। পাঠ্যবইয়ের দাম কেন বাড়ানো হলো সে ব্যাপারে এনসিটিবি কর্তৃপক্ষ কোনো সঠিক ব্যাখ্যাও দিতে পারছে না। আর পাঠ্যবইয়ের দাম বাড়ানোয় খোদ এনসিটিবির ভেতরে নানা প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে। তাছাড়া এবারের বইয়ের প্রকাশকের পক্ষ থেকে বইয়ের দাম বাড়ানোর কোনো আবেদন করা হয়নি। এমনকি প্রকাশক জানেও না যে বইয়ের দাম বাড়ানো হবে। এবার এনসিটিবি বাংলা, বাংলা সহপাঠ ও ইংরেজির প্রতিটি বই ৯ লাখ ৬০ হাজার কপি করে মুদ্রণ ও বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে। পাঠ্যবইয়ের দাম বাড়ানোয় এবার অভিভাবকদের পকেট থেকে ২ কোটি টাকার বেশি চলে যাবে। আর ওই টাকার ভাগ কে বা কারা পাবে তা নিয়েও নানা প্রশ্ন। এনসিটিবি এবং পাঠ্যবই মুদ্রণ শিল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বইয়ের প্রকাশনা সংস্থাকে লাভবান করে দিতেই এনসিটিবির কর্তাব্যক্তিরা উচ্চমাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবইয়ের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। অতীতে বিশেষ করে গত বছর প্রকাশকরা আবেদন করার পর দাম বাড়ানো হয়েছিল। কিন্তু প্রকাশকের পক্ষে কোনো আবেদন না করা সত্ত্বেও উপযাচক হয়ে দাম বাড়ানো হয়। গত বছর এনসিটিবি উচ্চ মাধ্যমিকের ৩টি বই ১৭টি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে বাজারজাত করিয়েছে। ওই কারণে বর্ধিত দরের লাভ ১৭ ভাগ হয়েছে। কিন্তু এবার নানা সমালোচনার মুখে একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়ার পাশাপাশি দরও বাড়িয়ে দেয়া নিয়ে নানা সংশয় ও প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে।
সূত্র জানায়, এবার বাংলা বইয়ের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১৪২ টাকা, যা ছিল ১৩০ টাকা। আর বাংলা সহপাঠের (উপন্যাস ও নাটক) দাম ৭২ টাকা, যা ছিল ৬৩ টাকা। উভয় বইয়ের দাম যথাক্রমে সোয়া ৯ ও সোয়া ১৪ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। বইয়ের দাম গত বছরও বাড়ানো হয়েছিল। তখন এ নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন এবং আপত্তি উঠেছিল। ২০১৭ সালে বাংলা বইয়ের দাম ছিল ১১৩ টাকা। আর ২০১৭ সালে সহপাঠের দাম ছিল ৫৫ টাকা। এমনভাবে ইংরেজি বইয়ের দাম ২০১৭ সালে ৮১ টাকা থাকলেও গত বছর ৯৩ টাকা হয়। ২০১৬ সালে আরেক দফা দাম বাড়ানো হয়েছিল। তখন এক লাফে বাংলা বইয়ের দাম ৪৫ টাকা থেকে ১১৩ টাকা করা হয়েছিল। অন্য বইয়ের দামও একই হারে বাড়ানো হয়। বইয়ের দাম বাড়ানোর জন্য এনসিটিবিতে একটি কমিটি আছে। কিন্তু ওই কমিটির সদস্যরা বইয়ের দাম বাড়ানোর ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। এমনকি কোনো তথ্য জানাতেও অপারগতা প্রকাশ করেছেন। অথচ এনসিটিবি যে দরে প্রকাশকদের বইয়ের কাজ দিয়েছে সে অনুযায়ী উচ্চ মাধ্যমিকের বাংলা বইয়ের মুদ্রণ খরচ সাড়ে ৩১ টাকা, সহপাঠের সাড়ে ১৩ টাকা এবং ইংরেজির প্রায় ১৯ টাকা পড়ে। আর ওই স্তরের বইয়ের জন্য এনসিটিবি সাড়ে ১১ শতাংশ রয়্যালটি নেয়।
সূত্র আরো জানায়, এবার এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ১৭ লাখ ৪৯ হাজার ১৬৫ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। তাছাড়া গত বছর ভর্তি না হওয়া প্রায় পৌনে দুই লাখ শিক্ষার্থীও রয়েছে। ওই হিসাবে এবার কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানে ১৯ লাখের বেশি শিক্ষার্থীর ভর্তি কার্যক্রমে অংশ নেয়ার কথা। কিন্তু ভর্তির জন্য ১৩ লাখ ১৩ হাজার ৩২৫ জন রেজিস্ট্রেশন করেছে। আর কারিগরি বোর্ডের অধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য প্রায় পৌনে দুই লাখ শিক্ষার্থী আবেদন করেছে। ওই হিসাবে শুধু এ বছরেই পাস করা প্রায় আড়াই লাখ শিক্ষার্থী এখন পর্যন্ত কোথাও আবেদন করেনি। ওসব শিক্ষার্থীর ড্রপআউট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গত বছর ভর্তি না হওয়া শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মেলালে এ সংখ্যা প্রায় সোয়া চার লাখ।
এদিকে মুদ্রণ সংশ্লিষ্টদের মতে, রয়্যালটির অর্থ, খুচরা পর্যায়ে বিক্রির কমিশন এবং মুদ্রাকরের লাভ যোগ করলেও কোনো বইয়ের দাম গত বছরের সমানও হতে পারে না। সেখানে এবার বইয়ের দাম বাড়ানো নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এ প্রসঙ্গে পাঠ্যবই ছাপা কাজের সংশ্লিষ্টদের সংগঠন মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম জানান, উচ্চ মাধ্যমিকের বই ছাপানো হয় ৬০ জিএসএম কাগজে। এনসিটিবিই এবার ওই কাগজ গত বছরের চেয়ে কম দামে কিনেছে। বাজারেও ওই কাগজের দাম কম। গত বছর প্রতি টনের দাম ছিল ৯০-৯২ হাজার টাকা, এবার তা ৭০-৭২ হাজার টাকা। তাছাড়া একই কাগজে মাধ্যমিকের একটি অংশের বই ছাপানো হচ্ছে। ওই বই প্রতি ফর্মা ১ টাকা ৪৫ পয়সা থেকে দেড় টাকায় ছাপা হয়েছে। এনসিটিবি এবার রয়্যালটিও বাড়ায়নি। ফলে কোনো হিসাবেই বইয়ের দাম বাড়তে পারে না।
অন্যদিকে এনসিটিবি সংশ্লিষ্ট অনেকের মতে, এবার বইয়ের কোনো প্যারামিটার বা উপাদানেরই দাম বাড়েনি। গত বছরের চেয়ে এবার এনসিটিবি কম দামে কাগজ কিনেছে। বাজারে কাগজ তৈরির পাল্পের (ম-) দাম কমেছে। প্লেট, কালি, গ্লুসহ বই ছাপানো ও বাঁধাইয়ের অন্য উপাদানের দামও গত বছরের তুলনায় কম। তাছাড়া বইয়ের পৃষ্ঠা সংখ্যাও বাড়েনি। এমনকি সরকারের তত্ত্বাবধানে থাকা তিনটি বইয়ের মধ্যে একটির দাম গত বছরের মতোই আছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই পাঠ্যবইয়ের দাম বাড়ানো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ প্রসঙ্গে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা জানান, যেসব প্যারামিটার বিবেচনায় নিলে বইয়ের দাম বাড়ানো যায় সেসব ধরেই দাম বাড়ানো হয়েছে। এ ব্যাপারে কমিটি আছে, তারা কাজ করেছে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে