ডিএ: দেশের সর্ব প্রথম লোহার খনি রংপুর জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার শানেরহাট ইউনিয়নের ভেলামারি পাথারে যা আবিষ্কৃত হয় ৫৫ বছর আগে। ১৯৬৪ সালে এই লোহার খনির অস্তিত্ব নিশ্চিত করে তৎকালিন পাকিস্তান খনিজসম্পদ বিভাগ এবং ১৯৯৯ সালে পুনরায় খনন শুরু করেছিল জিওলজিক্যাল সার্ভে অব বাংলাদেশ-জিএসবি। সুদীর্ঘ ৫৫ বছর আগে এই লোহার খনিটির প্রথম সন্ধান পাওয়া গেলেও আজ পর্যন্ত উত্তোলনের কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এদিকে নতুন করে দিনাজপুর জেলার হাকিমপুরের ইসবপুরে লোহার খনির অস্তিত্বের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়া হয়েছে গত মাসের ১৪ জুন। পনের দিন আগে সন্ধান পাওয়া লোহার খনির অস্তিত্বকে প্রথম বলে প্রচারণা চালানোয় ক্ষুব্ধ রংপুরের মানুষ। তারা অবিলম্বে পীরগঞ্জের ভেলামারি খনিকে প্রথম লোহার খনি স্বীকৃতি দিয়ে সেখান থেকে লোহা উত্তোলনের দাবি জানিয়েছেন। জিওলজিক্যাল সার্ভে অব বাংলাদেশ-জিএসবি এবং পেট্রোবাংলা সূত্রে পাওয়া তথ্য মতে, রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার শানেরহাট ও মিঠিপুর ইউনিয়নের মাঝামাঝি বিশাল একটি এলাকার নাম ভেলামারি পাথার। এখানেই প্রথম অস্তিত্ব আবিষ্কৃত হয়েছে বিশ্বমানের লৌহ খনির। ওই সময়ে খনি এলাকা চিহ্নিতকরণে বর্ণিত পাথারের মাঝখানে একটি জমিতে কংক্রিটের ঢালাই করে রাখা হয় অনুসন্ধান করা চারটি কূপের মুখ। ৫৫ বছর ধরে খনিমুখে কংক্রিটের ঢালাই ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। জেসবি ও পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, ১৯৬৪ সালের ৬ সেপ্টেম্বর পাক-ভারত যুদ্ধের পর স্যাটেলাইটের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী তৎকালীন পাকিস্তান খনিজসম্পদ বিভাগের একদল বিশেষজ্ঞ বিমান ও গাড়িবহর নিয়ে এই ভেলামারি পাথারে আসে। প্রায় ছয় বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই পাথারে তারা লৌহ খনির অবস্থান নিশ্চিত করতে বিমানের নিচে একটি বিশাল শক্তিশালী চুম্বক ঝুলিয়ে দেন। এরপর বিমানটি ট্রি লেবেলে পাথারের ওপর দিয়ে উড়ে যেতে থাকে। একপর্যায়ে বিমানের ঝুলন্ত চুম্বকটি ছোট পাহাড়পুর গ্রামের আবুল ফজল ও আবদুল ছাত্তার নামে দুই ব্যক্তির মালিকানাধিন জমির ওপর এসে আকর্ষিত হয়। এই আকর্ষণ বিমানটিকে বারবার মাটির দিকে টেনে নিচে নামাতে চেষ্টা করে। পরে অন্যান্য পরীক্ষার পর পাকিস্তানের খনিজ বিজ্ঞানীরা এখানে লোহার খনির অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হন। পরে উৎস হিসেবে ওই জমির ওপর কংক্রিটের ঢালাই করা চিহ্ন দিয়ে চলে যান। সূত্র জানায়, পরের বছর পাকিস্তান খনিজসম্পদ বিভাগ চিহ্নিত স্থানে খনন কাজ শুরু করেন। প্রায় আট মাস ধরে তারা ভেলামারী এলাকার পাশের কেশবপুর, ছোট পাহাড়পুর, প্রথমডাঙ্গা, পবনপাড়া, সদরা কুতুবপুর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় অসংখ্য স্থানে পাইপ বসিয়ে লোহার খনির সন্ধান নিশ্চিত করেন। অনুসন্ধানের সময় পাইপের ভেতর দিয়ে মাটির গভীরে বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। বোমার বিস্ফোরণে ওই এলাকার অনেক মাটির কুয়া ভেঙে যায়। পরে আবারো দ্বিতীয় দফায় পাইপের মাধ্যমে জরিপকাজ সম্পন্ন করা হয়। ১৯৬৭ সালের শেষের দিকে পাকিস্তান খনিজসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারাসহ একদল বিদেশী খনিজ বিশেষজ্ঞ রংপুরে আসেন। তারা অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির বিশাল বহর ও পরিবার পরিজনসহ স্থানীয় পানবাজার হাইস্কুল মাঠে অস্থায়ীভাবে ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা করে। প্রাপ্ত লোহার উপাদান উত্তোলন করেন। মাটির ৯০০ ফুট নিচ থেকে ২২ হাজার ফুট পর্যন্ত পাইপ খনন করে তারা লোহার উন্নতমানের স্তরের সন্ধান পেয়েছেন। এর বিস্তৃতি প্রায় ১০ বর্গ কিলোমিটার। টানা এক বছরের বেশি সময় ধরে ব্যাপক অনুসন্ধান শেষ করে ভেলামারিতে স্থাপনকৃত চারটি মূল পাইপের উৎসমুখে কংক্রিটের ঢালাইয়ের দিয়ে বন্ধ করে খনি কর্মকর্তারা তাদের ক্যাম্প গুটিয়ে চলে যান। এ সময় তারা বলে যান লৌহ অপরিপক্ব রয়েছে। আগামি ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যেই এটি উত্তোল যোগ্য হতে পারে। এ হিসেবানুয়ায়ী ৩৭ বছর আগে লোহা খনিটি পরিপক্কতা লাভ করেছে। সুতরাং এই খনিটি বর্তমানে উত্তোলনযোগ্য। বাংলাদেশ ভূ-তাত্ত্কি জরিপ অধিদফতর দ্বিতীয়বারের মতো ১৯৯৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে ভেলামারি পাথারে লোহার খনির অনুসন্ধান কাজ শুরু করেন। কিন্তু তারা পূর্বে আবিষ্কৃৃত লৌহ খনির উৎসমুখ ভেলামারি হতে প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরে বড় পাহাড়পুর গ্রামের পূর্বপ্রান্তে পরীক্ষামূলক খনন করে কোনো রিপোর্ট না দিয়েই চলে যান। ওই রিপোর্ট পরে পরিপূর্ণভাবে প্রকাশও করা হয়নি। তবে জিএসবি সূত্র এ প্রতিবেদককে নিশ্চিত করেছে, সেখানে অনুসন্ধান চালিয়ে উন্নতমানের আয়রন কোর (লোহা আকরিক) পাওয়া গেছে। কিন্তু সেখানে আয়রন কোরের রিজার্ভ কম হওয়ায় লৌহ উত্তোলনের সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি জিএসবি। কারণ হিসেবে তারা বলেছেন, রিজার্ভের পরিমান ইকোনমিক্যালি ভায়াবোল না হওয়ায় সেখানে লৌহ উত্তোলন করা সম্ভব হচ্ছে না। যে পরিমাণ খরচ হবে তা রিজার্ভ দিয়ে পুষিয়ে নেয়া সম্ভব হবে না বলেও উল্লেখ করেছেন ত্রাা। এরপর লৌহখনির অবস্থান ও উত্তোলনে আরো ব্যাপকভাবে কোনো অনুসন্ধান কিংবা উত্তোলনের কোনো উদ্যোগ নেয়নি জিএসবি। লৌহ খনিটি আবিস্কারের পর এখন প্রায় ৫৫ বছর অতিবাহিত হতে চলেছে। ভূতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্য মতে, পীরগঞ্জের ভেলামারি পাথারের এই লোহার খনিটি এখন পরিপক্কতা অর্জন করেছে। অথচ পেট্রোবাংলা অনুসন্ধান চালিয়ে চলে যাওয়ার পর এ ব্যাপারে আর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না। খনি এলাকার বাসিন্দা ও শানেরহাট ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান খবির উদ্দিন (৭৫) ছোটপাহাড়পুর গ্রামের খতিব উদ্দিন (৮০), প্রথমডাঙ্গা গ্রামের আবদুল করিম (৭০)বলেন আমরা সে সময় ২২/২৩ বছরের যুবক। স্বচক্ষে খনির খনন কাজ করতে দেখেছি, খনিটি অপরিপক্ক রয়েছে বলে অনুসন্ধানকারীরা চলে গেছেন। পীরগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান সাবেক সংসদ সদস্য নুর মোহাম্মদ মন্ডল জানান, আমাদের পীরগঞ্জের ভেলামারি পাথারেই লোহার খনি আবিষ্কার হয়েছে ৫৫ বছর আগে। পেট্রো বাংলার সাবেক পরিচালক মকবুল-ই-এলাহী চৌধুরী মশগুল বলেন-১৯৬৪ সালে বাংলাদেশে প্রথম লৌহ খনি আবিষ্কৃত হয় পীরগঞ্জে যা পেট্রো বাংলায় পীরগঞ্জ-১ ফাইল নামে সংরক্ষিত আছে। এটাই দেশের প্রথম লোহার খনি। দিনাজপুরের হাকিমপুরে লোহার খনির সন্ধান পাওয়া গেছে গত মাসে। এই জনপ্রতিনিধি আরো জানান, আমাদের এই খনি থেকেই লোহা উত্তোলন শুরু করতে হবে। ভূতত্ত্ববিদ পেট্রোবাংলার মহাব্যবস্থাপক এ বি এম কামরুজ্জামান পুলক জানান, জিওলজিক্যাল সার্ভে অব বাংলাদেশ-জিএসবি রংপুরের পীরগঞ্জের ভেলামারি পাথারে জরিপ চালিয়ে সে সময় প্রথম আয়রন কোরের (লৌহ আকরিকের) অস্তিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছিল। কিন্তু আয়রন কোরের রিজার্ভ কম হওয়ায় সেখানে লৌহ উত্তোলনের সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি জিএসবি। দিনাজপুরে জিএসবির জরিপ প্রাথমিক পর্যায়ে। তবে ধারণা করা হচ্ছে এখানে আয়রন কোরের পুরুত্বটা অনেক বেশি। সেখানে রিজার্ভ অনেক থাকতে পারে। ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতর ও পেট্রোবাংলার তথ্যানুযায়ী দেশে প্রথম লোহার খনির সন্ধান পাওয়া যায় রংপুরের পীরগঞ্জের ভেলামারির পাথারে। সেখানে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকার কূপ খনন করে অনুসন্ধান চালিয়ে উৎস মুখ নিশ্চিত করে। সুতরাং পীরগঞ্জের ভেলামরীরর পাথারে আবিষ্কৃত লোহার খনিটিই দেশের প্রথম লৌহ খনি একথা নিশ্চিত বলা চলে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে