এক্সক্লুসিভ: দেশের মোবাইল টেলিযোগাযোগ সেবা বড় ধরনের সঙ্কটে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নতুন ভ্যাট আইনের কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কারণ নতুন ভ্যাট আইনে বলা হয়েছে- নিবন্ধন ছাড়া কোনো সরকারি কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ভ্যাট আদায় করতে পারবে না। এমনকি ভ্যাট নিবন্ধন নেই এমন কোনো প্রতিষ্ঠানের ক্রয়-বিক্রয় বা লেনদেনও করা যাবে না। কিন্তু টেলিযোগাযোগ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা খোদ বিটিআরসিরই ভ্যাট নিবন্ধন না থাকা সত্ত্বেও সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ভ্যাট আদায় করছে। আর আগামী ১০ জুলাইর মধ্যে মোবাইল অপারেটরদের দ্বিতীয় প্রান্তিকে সরকারের সব ধরনের পাওনা পরিশোধের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এখন নতুন আইন অনুযায়ী বিটিআরসির ভ্যাট নিবন্ধন না থাকার কারণে মোবাইল অপারেটররা তাদের কাছে ভ্যাট পরিশোধ করতে পারবে না। একই সঙ্গে বেতার তরঙ্গ ব্যবহারসহ যেসব সেবার ক্ষেত্রে ভ্যাট পরিশোধের বাধ্যবাধকতা রয়েছে সেসব সেবাও বিটিআরসির কাছ থেকে নিতে পারবে না মোবাইল অপারেটররা। এমন অবস্থায় ১০ জুলাই থেকে সার্বিকভাবে মোবাইল টেলিযোগাযোগ সেবাই বড় ধরনের সংকটে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিটিআরসি এবং অ্যামটব সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বিগত ২০১১ সালে মোবাইল অপারেটরদের টুজি লাইসেন্স নবায়নের সময়ই বিটিআরসির ভ্যাট নিবন্ধন না থাকার বিষয়টি সামনে আসে। নিবন্ধন না থাকা সত্ত্বেও বিটিআরসি কীভাবে ভ্যাট আদায় করছে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে অপারেটররা। তখন এনবিআর থেকে একটি বিশেষ কোড বরাদ্দ নিয়ে বিটিআরসি ভ্যাট আদায় শুরু করে। এক পর্যায়ে এ বিতর্ক আইনি লড়াই হিসেবে আদালতে গড়ায়। মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোন এবং রবি এ বিষয়ে পৃথক রিট দায়ের করে। ২০১৪ সালে হাইকোর্ট রবির দায়ের করা রিটের রায়ে বিটিআরসিকে ভ্যাট নিবন্ধন নেয়ার নির্দেশ দেন। ওই নির্দেশের বিরুদ্ধে সে সময় আপিল বিভাগে আপিল দায়ের করে বিটিআরসি। কিন্তু ওই আপিলটি এখন পর্যন্ত নিষ্পত্তি হয়নি। ফলে বিটিআরসি ভ্যাট নিবন্ধনের জন্য আবেদন করলেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বিটিআরসিকে ভ্যাট নিবন্ধন দিতে পারছে না।
সূত্র জানায়, এখন পর্যন্ত বিটিআরসি এনবিআরের একটি কোডের মাধ্যমে লাইসেন্স নবায়ন ফি, বেতার তরঙ্গ নবায়ন বাবদ সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে ভ্যাট আদায় করে সরকারের কাছে দিয়ে আসছে। তবে রাজস্ব আয়ের ভাগাভাগির ক্ষেত্রে মোবাইল অপারেটররা বিটিআরসিকে ভ্যাট দেয়নি। এর কারণ রাজস্ব ভাগাভাগির বিষয়টিই এক ধরনের কর। এর ওপর নতুন করে ১৫ শতাংশ ভ্যাট যৌক্তিক নয়। যদিও এনবিআর বিশেষ পরিপত্র জারি করে রাজস্ব ভাগাভাগির ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট রেয়াত সুবিধা দিয়েছিল। কিন্তু নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর হওয়ার পর আগের ওই পরিপত্র আর বহাল নেই। ফলে এখন মোবাইল অপারেটরদের রাজস্ব ভাগাভাগির ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতেই হবে। আর এখানেই বড় জটিলতার সৃষ্টি হচ্ছে। বিটিআরসির ভ্যাট নিবন্ধন না থাকার কারণে নতুন ভ্যাট অনুযায়ী বিটিআরসির কাছে মোবাইল অপারেটরদের ভ্যাট পরিশোধের সুযোগ নেই। পাশাপাশি বিটিআরসির কাছ থেকে কোনো সেবা নেওয়ারও সুযোগ নেই। আবার ১০ জুলাইয়ের মধ্যে সরকারের সব পাওনা পরিশোধ করতে হবে। এখন ১০ তারিখ থেকে মোবাইল অপারেটররা কী করবে ওই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে সামনে চলে এসেছে। মূলত আইনি জটিলতার কারণেই বিটিআরসির ভ্যাট নিবন্ধন আটকে আছে। ওই আইনি জটিলতা নিরসন হলে এনবিআর এখনই বিটিআরসিকে নিবন্ধন দিয়ে দিতে পারে।
এদিকে ভ্যাট নিয়ে জটিলতা প্রসঙ্গে ইতিমধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মূসক বিভাগের সঙ্গে চারটি মোবাইল অপারেটরের শীর্ষ কর্মকর্তারা বৈঠক করেছেন। কিন্তু বৈঠক থেকে জটিলতা নিরসনে সন্তোষজনক সমাধান আসেনি। এ ব্যাপারে অ্যামটব মহাসচিব এস এম ফরহাদ জানান, মোবাইল অপারেটররা সব সময়ই সরকারের আইন ও নীতি অনুযায়ী সরকারের প্রাপ্য অর্থ যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়ে আসছে। এতদিন সেভাবেই চলেছে। কিন্তু এখন নতুন ভ্যাট আইন অনুযায়ী অর্থ আদায়কারী প্রতিষ্ঠানেরও ভ্যাট নিবন্ধন থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তাই টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভ্যাট নিবন্ধন দ্রুত হওয়া দরকার। তা না হলে অপারেটররা তাদের সেবা দান কার্যক্রম চালু রাখা নিয়ে বেশ জটিলতায় পড়ে যাবে। অ্যামটব আশা করছে জটিলতা নিরসনে সংশ্নিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো দ্রুত পদক্ষেপ নেবে।
অন্যদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতি প্রসঙ্গে বিটিআরসির চেয়ারম্যান জহুরুল হক সমকালকে জানান, বিটিআরসি আরো প্রায় ৬ মাসের বেশি আগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে ভ্যাট নিবন্ধন চেয়েছে। এর পর একাধিকবার তাদের তাগাদা দেয়া হয়েছে। কিন্তু এনবিআর নিবন্ধন দেয়নি। তবে নিবন্ধন না পেলেও বিটিআরসি যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করেই ভ্যাট আদায় করছে এবং সরকারের কাছে পরিশোধ করছে। ফলে এ নিয়ে জটিলতার কিছু আছে কিংবা নতুন করে কোনো জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার কোনো কারণ নেই।
এ ব্যাপারে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার জানান, আরো অনেক আগেই বিটিআরসিকে ভ্যাট নিবন্ধন নেয়ার জন্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। বিটিআরসি ভ্যাট নিবন্ধন নিলেই এ জটিলতা কেটে যাবে। মন্ত্রণালয়ের অবস্থান পরিস্কার, মন্ত্রণালয় চায় বিটিআরসি দ্রুত ভ্যাট নিবন্ধন নিয়ে নিক।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে