এক্সক্লুসিভ: রাষ্ট্রীয় সড়ক পরিবহন সংস্থা বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশনের (বিআরটিসির) জন্য সরকার বিপুল টাকা খরচ করে নতুন বাস কিনলে স্বল্পসময়েই তা নষ্ট হয়ে যায়। বিআরটিসির নতুন বাসগুলো লাইফ টাইমের তিন ভাগের একভাগ সময়ও রাস্তায় চলার নজির নেই। বরং খুব স্বল্পসময়ের মধ্যে মেরামত কারখানায় ওসব বাসের ঠাঁই হয়। আর সংস্থায় গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট চক্রের কারসাজির কারণে লক্কড়-ঝক্কড় গাড়ি বছরের পর বছর ডিপোতে পড়ে থাকে। প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না থাকা ও আধুনিক মেরামত কারখানার অভাবে ওসব বাস সহজেই সংস্কারের মুখ দেখে না। এমনও রয়েছে নতুন আমদানি করা বাসে দুই মাসের মাথায় ছাদ ফুটো হয়ে পানি পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে বিআরটিসির বাসগুলো এতো স্বল্পসময়ে কীভাবে নষ্ট হচ্ছে। বিআরটিসি সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, গত প্রায় দুই দশকে বিআরটিসির জন্য কেনা সব বাস নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিগত ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে বিআরটিসির জন্য প্রগতির কাছ থেকে মাসিক কিস্তিতে ৪১৭টি ভারতীয় টাটা কামিজ বাস কেনা হয়েছিল। ওসব বাস ১০ বছর সচল থাকার কথা থাকলেও পাঁচ বছরের মাথায় বিকল হয়ে পড়ে। বর্তমানে সংস্থাটির প্রায় শ’খানেক বাস কোন মতে সচল রয়েছে। বিগত ২০০৯ সালে চীন থেকে ১২২ কোটি ৪৯ লাখ টাকায় কেনা হয় ২৭৯ ডং ফেং বাস। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দুই বছরের মাথায় ওসব বাস নষ্ট হতে শুরু করে। এখন ১৫৯টি বাসই চলাচলের একেবারে অযোগ্য। বাকিগুলো বিভিন্ন ডিপোতে অচল রয়েছে। ২০১৩ সালে ২৮২ কোটি টাকায় আনা হয় দক্ষিণ কোরিয়ার দাইয়ু কোম্পানির ২৫৫টি বাস। প্রতিটি বাসের দাম পড়ে কোটি টাকার বেশি। কারিগরি শাখার তথ্যানুযায়ী ৬ বছর পার না হতেই ৮১ বাস নষ্ট হয়ে যায়। সেগুলো এখন মেরামত অযোগ্য। আর ২০১৩ সালে ভারত থেকে ঋণ নিয়ে কেনা আর্টিকুলেটেডসহ ৪২৮ বাসের ৩৩টি বিকল হয়ে গেছে।
সূত্র জানায়, সর্বশেষ দুই মাস আগে নতুন গাড়ি বহর যুক্ত হওয়ার আগে বিআরটিসির অধীনে ছিল ১ হাজার ৪৪৫ বাস। সেগুলোর মধ্যে সচল ৯২১টি। আর অকেজো অবস্থায় ডিপোতে পড়ে আছে ৫২৪ বাস। তার মধ্যে ৩৬০টি বাস বড় ধরনের মেরামত প্রয়োজন। তার বাইরে সময়ে সময়ে আরো প্রায় আড়াইশ’ বাস নষ্ট হয়ে থাকে। আর মেরামত করা ১৬৪ বাস আর্থিকভাবে কার্যকর লাভজনক নয়। বর্তমানে বিআরটিসির বাস চলাচল করে ৩৯১ রুটে। সব মিলিয়ে সংস্থাটির প্রায় ৮০০ বাস নষ্ট। রাষ্ট্রায়ত্ত পরিবহন সংস্থাটি গত আড়াই বছর ধরে লোকসান গুনছে। এ প্রতিষ্ঠানের বর্তমানে ৯ কোটি টাকার বেশি লোকসান। যে কারণে কল্যাণপুর ডিপো ছাড়া দেশের সবকটি বাস ডিপোতে বেতন বকেয়া পড়েছে। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ চলছে। তাছাড়া গত কয়েক বছরে বিআরটিসির কেনা ৫শ’ বাসই এখন ভাঙ্গাড়ি হিসেবে বিক্রির অপেক্ষায় রয়েছে। যাত্রীবাহী বাস ২০ থেকে ২৫ বছর রাস্তায় সচল থাকলেও বিআরটিসির বাস কেন ৩-৫ বছরের বেশি চলে না। অথচ যথাযথ পরিচর্যা করলে একেকটি বাস ২০ বছর পর্যন্ত সচল রাখা যায় বলে জানান পরিবহন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র আরো জানায়, বাস কেনার জন্য মন্ত্রণালয় ও বিআরটিসি মিলে গঠিত কমিটি একাধিকবার সংশ্লিষ্ট দেশে গিয়ে বাস দেখে এলেও শেষ পর্যন্ত শতভাগ মান নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। মূলত মান যাচাই না করেই প্রতিবার বাস আমদানি করা হয়। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে ওসব পরিবহন নষ্ট হয়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে, ক্রয় সংক্রান্ত কমিটির উদাসীনতা ও দুর্নীতির কারণেই বিআরটিসি বারবার বাস আমদানিতে ধরা খাচ্ছে। এক পর্যায়ে ওসব বাস ডিপোতে ঢুকিয়ে মেরামতের চেষ্টা চলে। মেরামতের নামে যন্ত্রপাতি আরো বিকল ও হারিয়ে যায়। ওই প্রেক্ষিতে কিছুদিন পর বেশিরভাগ বাস মেরামতের অযোগ্য ঘোষণা হয়। নিলামে বিক্রি হয় যন্ত্রপাতি। আবারও তৎপরতা শুরু হয় নতুন পরিবহন আমদানির।
এদিকে ১৯৯৯ সালে সুইডেন থেকে ৫০টি দোতলা ভলভো বাস কেনা হয়েছিল। এগুলো রাস্তায় নামানো হয়েছিল ২০০২ সালে। ৬ বছরের মাথায় নষ্ট হতে শুরু হলে ৪৮টিরইি মেরামত করা হয়নি ৪৮টির। ৫০টি দ্বিতল ভলভো বাসের মধ্যে এখন চলছে মাত্র দুটো। অচল বাসগুলো মিরপুর-১২ ও গাজীপুর ডিপোতে পড়ে আছে। একেকটি বাসের দাম পড়েছিল এক কোটি তিন লাখ টাকা। সুইডেন থেকে আমদানি করা এ বাসগুলোর জীবনকাল ধরা হয়েছিল ১৫ বছর। কিন্তু যথাসময়ে যন্ত্রাংশ লাগানো না হওয়ায় সেগুলো অচল হয়ে গেছে। জানা যায়, ভলভো বাসগুলো মানসম্মত ছিল না। বাস কেনা হলেও যন্ত্রপাতি কেনা হয়নি। তাছাড়া এর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও বেশি। তাছাড়া দোতলা ভলভোর চেয়ে বেশি দাম দিয়ে কেনা হয়েছিল ৫০টি জোড়াবাস। ৫৪ ফুট লম্বা এ জোড়াবাসের বাহারি নাম ‘আর্টিকুলেটেড বাস’। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চলতে দেখে শখের বশেই এদেশেও এটি আনা হয়। একেকটি জোড়াবাসের দাম পড়েছিল এক কোটি ১১ লাখ টাকা। ওসব বাস কেনার সময় জোড়া লাগানো অংশগুলো পুর্নস্থাপনের বিষয়টিও বিবেচনায় নেয়া হয়নি। খুচরা যন্ত্রাংশ কেনা হয়নি। ফলে কয়েক বছরের মধ্যেই বেশিরভাগ বাস অচল হয়ে পড়ে। আর সিঙ্গেল ডেকার বাসের মধ্যে কোরিয়া থেকে আনা হয় ২৫৩টি, এর মধ্যে ১৮৫টি নষ্ট। চীন থেকে আনা হয় ২৪৫টি সিঙ্গেল ডেকার বাস। তার মধ্যে নষ্ট হয়ে আছে ১২৭টি। ভারত থেকে আনা হয়েছিল ৪৪৩টি সিঙ্গেল ডেকার বাস। নষ্ট হয়ে আছে ১৮৮টি। ভারত থেকে কেনা হয়েছিল ৪৫৮টি ডাবল ডেকার বাস। তার মধ্যে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে ১৫২টি। ২০১২ সালে কোরিয়া থেকে কেনা ৪৫টি বাস এবং ভারত থেকে কেনা ৩০টি বাসই বিকল হয়ে গেছে। তাছাড়া রাজনৈতিক সহিংসতায় আগুনে পুড়ে অচল হয়েছে ৫টি বাস। এর আগে ২০১০ সালে নরডিক ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের (এনডিএফ) ঋণে চীন থেকে কেনা ২৭৫টি বাসের মধ্যে ১১৫টিই অচল হয়ে আছে বিভিন্ন ডিপোতে।
বিআরটিসি কর্মকর্তারা বলছেন, রাষ্ট্রীয় এই পরিবহন সংস্থায় হাজারো ভূতে ঘর বেঁধেছে। সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ডিপো ও মেরামত কারখানা পর্যন্ত সিন্ডিকেট চক্রের কারণেই মূলত অনেক সময় ভাল বাসও অচল হয়ে যায়। বারবার আক্রান্ত হয় রোগে। কিন্তু রোগ আর সারে না। বাংলাদেশের কাছে ২০১৩ সালে ৩০০ সিএনজিচালিত বাস বিক্রি করেছিল দক্ষিণ কোরিয়া। দাইয়ু কোম্পানির বাসগুলোর অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল বলা হয়েছিল ১৫ বছর। অথচ ৬ বছর না হতেই বেশিরভাগ বাস লক্কড়-ঝক্কড় হয়ে যায়। ওসব বাস মেরামতে বাংলাদেশ সরকারকে প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন ফান্ড (ইডিসিএফ)। দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আনা ৫২ আসনের ৩০০ দাইয়ু বাসের মধ্যে ১৫০ এসি ও ১৫০টি নন-এসি। তার মধ্যে ৮টি একেবারেই মেরামতের অযোগ্য। চারটি পুড়েছে রাজনৈতিক আগুনে। বাকি সব বাসেরই লক্কড়-ঝক্কড় অবস্থা। কিছু বাস ঢাকা-গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিআরটিসি ডিপোতে রেখে একদিন মেরামত করে দু’দিন চালানো হয়। তবে ১৪১টি বাসের জরুরি মেরামত প্রয়োজন ছিল। সেক্ষেত্রে বিআরটিসি হিমশিম খাচ্ছিল বিধায় তারা দক্ষিণ কোরিয়ারই উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ইডিসিএফের দ্বারস্থ হয়। আর ওই আহ্বানে সাড়া দিয়ে অনুদানের হাত বাড়িয়েছে দিয়েছে দক্ষিণ কোরীয় সংস্থাটি। তারা যে অনুদান দিয়েছে তাতে এখন ৪০ বাসের মেরামত সম্ভব। নিজস্ব অর্থায়নে মেরামত চলছে আরো ২০টির। তারপরও আরো ৮১ বাসের মেরামত জরুরী। বিআরটিসির বিভিন্ন ধরনের বাসের সংখ্যা ১ হাজার ৪৪৫টি। এর মধ্যে নষ্ট অবস্থায় পড়ে আছে ৫২৪টি। আর সচল বাসের মধ্যে ঢাকায় চলছে ৬২০টি। তার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারী অফিসের স্টাফ বাস ২৭২টি। সাধারণ যাত্রীসেবায় নিয়োজিত রয়েছে ৩৪৮টি বাস। এর মধ্যে আবার বেসরকারী খাতে ইজারায় চলছে ৮৮টি বাস। আর ঢাকার বাইরে চলাচল করছে ৩০১টি বাস।
অন্যদিকে বিআরটিসির নিজস্ব দুটি ওয়ার্কশপ থাকলেও সেখানে বাস মেরামতের তেমন একটা সুযোগ নেই। তার মধ্যে গাজীপুরে লগোপাড়ায় অবস্থিত সমন্বিত কেন্দ্রীয় ওয়ার্কশপটি (মেরামত কারখানা) দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। আর রাজধানীর তেজগাঁওয়ের কেন্দ্রীয় ওয়ার্কশপটি মূলত সরকারী, আধাসরকারী ও স্বায়ত্তশাসিত বিভিন্ন সংস্থার হালকা গাড়ি (জীপ, মাইক্রোবাস) এবং অল্পসংখ্যক বাস-ট্রাক মেরামতের কাজ করে থাকে। তবে এ ওয়ার্কশপে বিআরটিসির কোন বাসের মেরামত হয় না। গাজীপুরের ওয়ার্কশপটি ১৯৮১ সালে ১৪ একর জায়গার ওপর জাপানী কারিগরি ও আর্থিক অনুদানে নির্মিত হয়। ওই ওয়ার্কশপে গাড়ি সংযোজন, বডি নির্মাণ ও গাড়ি মেরামত করা হতো। সেখানেই ভলভো দ্বিতল বাস-এর বডি সংযোজন করা হয়েছিল। তাছাড়া ২০০৯ সালে সরকারের কাছ থেকে ৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ১১১টি একতলা ও দ্বিতল গাড়ির ভারি মেরামত কাজ সম্পন্ন করা হয় এখানে। কিন্তু আর্থিক সমস্যার কারণে বর্তমানে ওয়ার্কশপের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। বিআরটিসির বাস চলাচল করে মূলত ১৯ ডিপো থেকে। এর মধ্যে মাত্র দুটি ডিপোতে (কমলাপুর ও কল্যাণপুর) রয়েছে শেডের ব্যবস্থা। সেসব স্থানে গাড়ির সামান্য ত্রুটি সারাতেও দৈনিক ভিত্তিতে বাইরে থেকে টেকনিশিয়ান নিয়ে আসতে হয়। এছাড়া সংস্থাটির গাড়ি ধোয়ার জন্য নেই কোন ওয়াশিং প্ল্যান্ট। গাড়ি পরিষ্কারের কাজ ম্যানুয়ালি করা হয়।
এ বিষয়ে বিআরটিসির চেয়ারম্যান ফরিদ আহমদ ভূঁইয়া জানান, দক্ষিণ কোরিয়া সহজ ঋণে আমাদের বাস সরবরাহ করেছিল। এখন বাসগুলো মেরামতেও চার লাখ ডলার অনুদান দিয়েছে। এই অনুদান ও সরকারী অর্থায়নে মোট ৬০টি বাস মেরামত করা হচ্ছে। কিছু বাস ইতোমধ্যে সড়কে চলাচলও করছে। আরও ৮১ বাস মেরামত জরুরী। সেজন্য দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে আরো ৩০ লাখ ডলার অনুদান চাওয়া হয়েছে। আর ইন্ডিয়া থেকে আনা বাসের ইঞ্জিন টাটার তৈরি হলেও, বডি এসিজিএল গোয়া নামের একটি ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের তৈরি। চুক্তি অনুযায়ী, তারা দুই বছর বিক্রয়োত্তর সেবা দেবে। তাদের প্রতিনিধিদের ডাকা হয়েছে। তারা বাংলাদেশে এসে সমস্যার সমাধান করে দেবে। ভারত থেকে কেনা বাসগুলোর আয়ুষ্কাল ধরা হয়েছে ২০ বছর।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে