এক্সক্লুসিভ: সীমান্ত দিয়ে দেশে অবৈধভাবে আসা অস্ত্র, মাদকদ্রব্যসহ অন্যান্য পণ্য বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিস ও পরিবহন সংস্থার মাধ্যমে দেশের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছড়িয়ে পড়ছে। এমনকি মুক্তিপণ আদায়ের জন্য অপরাধীরা এখন কৌশল বদলে কুরিয়ারের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করছে। দেশে কুরিয়ার সার্ভিস একক কোনো সংস্থার নজরদারিতে না থাকার কারণে দিন দিন এসব ঘটনা বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে দেশের কুরিয়ার সার্ভিসগুলোতে মাদক ও অস্ত্র শনাক্তকরণে স্ক্যানার মেশিন এবং গ্রাহকদের তথ্য সংরক্ষণ (কেওয়াইসি)। পাশাপাশি কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের সীমাও বেঁধে দেয়া হবে। আর কুরিয়ার সার্ভিসের সার্বিক কর্মকা- ডাক বিভাগের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয় মনিটর করবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ প্রতিষ্ঠান বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, এদেশে কুরিয়ার সার্ভিসগুলো ৩০ বছর ধরে ব্যবসা করলেও যুগোপযোগী কোনো আইন নেই। একক নিয়ন্ত্রক সংস্থাও নেই। শত বছরের পুরনো পোস্টাল আইন (১৮৯৮) দিয়েই চলছে কুরিয়ার সার্ভিস। ফলে অনেক বিষয়ই আড়ালে থেকে যাচ্ছে। কুরিয়ার সার্ভিসগুলোতে অস্ত্র ও পণ্য স্ক্যানার নেই। ওসব প্রতিষ্ঠানে সঠিক নজরদারিরও অভাব রয়েছে। ফলে অপরাধীরা এর সুযোগ নিচ্ছে। এর সঙ্গে কুরিয়ার সার্ভিসের কিছু অসাধু কর্মচারীও জড়িত। ওসব কর্মচারীর যোগসাজশে আমদানি নিষিদ্ধ পণ্যও কুরিয়ারে দেশের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাচ্ছে। প্রায়ই এসব পণ্য ধরা পড়লেও কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবসায়ীরা এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেয় না। শুধু দেশি নয়, দেশে কাজ করা বিদেশি কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমেও অহরহ দেশ-বিদেশে পণ্য পাচারের ঘটনা ঘটছে। এমন পরিস্থিতিতে কুরিয়ার সার্ভিসগুলোর কর্মকা- বিষয়ে অতিসম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে মোবাইল ফিন্যান্সশিয়াল সার্ভিস ও কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ঘুষ আদান-প্রদান এবং মানি লন্ডারিংয়ের ঝুঁকি নিরসনে একটি আন্তঃসংস্থা বৈঠক হয়। ওই বৈঠকেই কুরিয়ার সার্ভিসগুলোকে নজরদারির আওতায় আনার ব্যাপারে বিশদ আলোচনা হয়।
সূত্র জানায়, আগে অপরাধীরা অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ে মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিস ব্যবহার করতো। ওই কারণে কক্সবাজার, বান্দরবানের মতো এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। মোবাইল ব্যাংকিং নিরাপদ রাখতে সীমা নির্ধারণসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ফলে অপরাধীরা এখন কৌশল বদলে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করছে। শুধু অপরাধী নয়, বিভিন্ন কাজের জন্য ঘুষ লেনদেনেও কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করা হচ্ছে। তাই মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মতো কুরিয়ার সার্ভিসে লেনদেনের ক্ষেত্রে সীমা নির্ধারণ করে দেয়া হবে। পাশাপাশি অর্থ প্রেরণকারী ও গ্রহণকারীর তথ্য সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হবে। সেজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
সূত্র আরো জানায়, কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্ক্যানার মেশিন না থাকার কথা ওসব প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা স্বীকার করেছেন। তাদের মতে, স্ক্যানিং মেশিনের দাম বেশি। সেজন্য বাংলাদেশের কোনো কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠানই স্ক্যানার মেশিন ব্যবহার করে না। সবাই ফিজিক্যালিই পণ্য চেক করে। তবে বুকিংদাতার জাতীয় পরিচয়পত্র, ড্রাইভিং লাইসেন্স বা পাসপোর্টের ফটোকপি ছাড়া আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসে পার্শেল বুকিং নেয়া হয় না।
এদিকে এ বিষয়ে বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) প্রধান আবু হেনা মোহাম্মদ রাজি হাসান জানান, কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে অবৈধ অস্ত্র, চোরাচালানকৃত পণ্য ও মাদক বহন করার অভিযোগ রয়েছে। ওজন্য ওসব প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় মনিটরিংয়ের আওতায় নিয়ে আসা হবে। কারণ অনেক ক্ষেত্রে সীমান্ত থেকেও অবৈধ অস্ত্র আসে, যা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। মাদকের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তাছাড়া আগে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মুক্তিপণের টাকা নেয়া হতো। সেগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন হলে তা চিহ্নিত করার কোনো উপায় থাকে না। সেজন্য কুরিয়ার সার্ভিসের একটি ‘রেগুলেটরি বডি বা নিয়ন্ত্রক সংস্থা’ থাকতে হবে। তা খুব জরুরি হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে একই প্রসঙ্গে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. আসাদুল ইসলাম জানান, এ ব্যাপারে একটি বৈঠক হয়েছে। আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি।’

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে